মানব জীবনে এন্টিবায়োটিকের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব


ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাসদের ধ্বংস করা কিংবা তাদের বংশবৃদ্ধি রোধ করার জন্য ব্যবহিত বিশেষ এক ধরনের ওষুধ বা উপাদানই হচ্ছে এন্টিবায়োটিক। আবার এই এন্টিবায়োটিকও কিন্তু তৈরি করা হয়ে থাকে ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাস থেকেই।
এছাড়াও এন্টিবায়োটিক ওষুধ তৈরি করা হয়ে থাকে প্রকৃতিতে সহজলভ্য বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ অথবা বিভিন্ন জীবাণুর নির্যাস বা নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থ হতে।
এই অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের শরীরে বাসকারী বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াদের ধ্বংস করে নানা প্রকার সংক্রমণের হাত থেকে আমাদের শরীরকে রক্ষা করে থাকে।
নানা উপায়ে মানুষের শরীরে বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবাণু জন্ম নেয়, এসব জীবাণু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করতে পারে না, বরং তারা একই স্থানে অবস্থান করে শরীরকে সংক্রমিত করতে থাকে।
 আর যখন এন্টিবায়োটিক শরীরে প্রবেশ করানো হয়, তখন ওই ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণুগুলো এন্টিবায়োটিকের সঙ্গে লড়াই করে টিকতে পারে না, ফলে ক্ষতিকর জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়াগুলো মারা যায়। আর এভাবেই এন্টিবায়োটিক মানব দেহকে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের হাত থেকে রক্ষা করে থাকে।
এভাবে এন্টিবায়োটিক আমাদের জীবন রক্ষা করলেও, আবার যদি এন্টিবায়োটিককে সঠিক উপায়ে ব্যবহার না করা হয়, তবে এই এন্টিবায়োটিকই আমাদের জন্য মরনঘাতি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
শরীর থেকে ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করতে হলে, অবশ্যই এন্টিবায়োটিকের পূর্ণ কোর্স শরীরে প্রবেশ করাতে হবে।
আর যদি কোর্স শেষ না করা হয়, তবে কিছু জীবাণু বেঁচে থাকে। এই জীবিত জীবাণুগুলো তখন নিজেদেরকে ঐ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করার মতো সক্ষম হিসেবে গঠন করে এবং নতুনভাবে শরীরে সংক্রমণ শুরু করে। এবার পুনরায় ঐ একই এন্টিবায়োটিক শরীরে প্রবেশ করালে, তখন জীবাণুগুলোঐ এন্টিবায়োটিক থেকে নিজেদেরকে সহজেই রক্ষা করতে সক্ষম হয়। এভাবেই এন্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোগ প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়।
এন্টিবায়োটিক শুধু মানব দেহের রোগ প্রতিরোধেই সহায়তা করে না, বরং রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করে। কিন্তু সম্পূর্ণ কোর্স মানবদেহে প্রবেশ না করালে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি না পেয়ে, কমে যায়।
মানব দেহে মূলত জীবাণু এবং এন্টিবায়োটিকের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়ে থাকে।
ব্যাকটেরিয়াগুলো এন্টিবায়োটিকের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকার জন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
মনে করুন, একটি মানুষের শরীরে ৫০ টি ব্যাকটেরিয়া কোনো রোগ সৃষ্টি করেছে, এই রোগ মুক্তির জন্য যদি ব্যক্তিটি এন্টিবায়োটিক ঠিকমতো গ্রহণ করে, তবে সব ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। তখন ব্যাকটেরিয়া আর কোনো ক্ষতি করতে পারে না।
কিন্তু ব্যক্তিটি যদি কোর্স শেষ না করেই, এন্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ করে দেয়। এক্ষেত্রে সব ব্যাকটেরিয়া মারা যায় না, এতে যদি একটি ব্যাকটেরিয়াও বেঁচে থাকে, তবে ঐ ব্যাকটেরিয়াটি ঐ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করার মতো ক্ষমতা ও কৌশল আয়ত্ত্ব করতে সক্ষম হয়।
 তারপর এই ব্যাকটেরিয়া মাধ্যমে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ারাও এই প্রতিরোধ করার কৌশল আয়ত্ত্ব করে ফেলে।
আর মানবদেহের ব্যাকটেরিয়াগুলো বিভিন্নভাবে একজনের দেহ থেকে অন্যজনের শরীরে বাসা বাঁধতে পারে।স্পর্শ, হাঁচি- কাশি, খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা বিভিন্ন মাধ্যমে এক দেহ থেকে অন্য দেহে ছড়িয়ে পড়ে।
যেসব ব্যাকটেরিয়াগুলো এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করতে পারে, তাদেরকে রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া বলা হয়ে থাকে। এসব রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়াগুলো মাধ্যমে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ারাও রেজিস্ট্যান্ট হয়ে ওঠে।
এভাবে একটি মানব দেহের সকল ব্যাকটেরিয়া রেজিস্ট্যান্ট রূপান্তরিত হয়ে যায়। আর যখন কোনো ব্যক্তির দেহের সকল ব্যাকটেরিয়া রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়াতে রূপান্তরিত হয়, তখন ঐ ব্যক্তির মৃত্যু অনিবার্য হয়ে যায়।
একটি এন্টিবায়োটিকে একটি ব্যাকটেরিয়া রেজিস্ট্যান্ট করতে পারলেই, ঐ ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া রেজিস্ট্যান্ট করতে পারে। আর এভাবে যখন মানুষের আবিষ্কৃত সকল এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্টকারী ব্যাকটেরিয়া সৃষ্টি হয়ে যায়, তখন পুরো মানবজাতির জন্যই তা হুমকি স্বরুপ হয়ে দাঁড়ায়।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.